দুর্মূল্যের এই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম হুঁ হুঁ করে বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোই এখন জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেককেই। যেখানে প্রতিদিনের চাহিদা মেটানোই দায় সেখানে সঞ্চয়ের কথা তো ভাবাই যায় না।
তবে একটু মাথা খাটিয়ে কিছু পরিকল্পনা করতে পারলে সংসারের এই দৈনন্দিন খরচ কমিয়ে নিয়ে আসার পাশাপাশি দিন বা মাস শেষে একটু সঞ্চয় করাও সম্ভব হবে যার জন্য প্রয়োজন একটু সচেতনতা।
চলুন জেনে নেয়া যাক সংসারের দৈনন্দিন খরচ কমানোর টেকনিক
প্রথমত সব খরচের একটি তালিকা তৈরি করুন
সংসারের দৈনন্দিন খরচ কমানোর জন্য আপনাকে প্রথমত সারা মাসের একটি সম্ভাব্য খরচের তালিকা করতে হবে। প্রতিদিন আপনি যে ছোটখাটো খরচ করেন সেটা আপনি খাতায় লিখে রাখুন। দেখবেন মাস শেষে আপনার টাকা খরচের যোগফল কিন্তু বেশ বড়ই হবে। এত আপনি অদরকারি খরচের খাত চিহ্নিত করতে পারবেন সহজেই। এই বিষয়টি আপনাকে অনেক খরচ কমাতে সহায়তা করবে।
বিলাসবহুল সৌন্দর্যপণ্য এড়িয়ে চলা
ত্বকের বলিরেখা থেকে মুক্তি পেতে এবং ত্বক সুন্দর রাখতে আমরা দামি ক্রিম ব্যবহারে প্রলুব্ধ হয়ে থাকি। কিন্তু, বাস্তবে ত্বকের প্রয়োজন হলো একটি ভালো ডায়েট। দরকার প্রচুর পরিমাণে পানি ও হাইড্রেশন। এজন্য ব্যয়বহুল ক্রিমের পরিবর্তে বাদাম বা নারকেল তেল ব্যবহার করুন। এতে ত্বক ভালো থাকবে আবার সংসারের খরচও কমবে।
হেঁটে বা সাইকেলে কর্মস্থলে যাওয়া
আপনার কর্মস্থল যদি বাসার কাছাকাছি হয়। তাহলে হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে যেতে পারেন। এই অভ্যাস খরচ কমানোর জন্য খুবই কার্যকরী উপায়।
ব্র্যান্ডের পণ্য এড়িয়ে চলা
সংসারের প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস আমরা ব্রান্ড থেকে কিনে থাকি। কিন্তু, খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্রান্ডের পণ্য আর সাধারণ পণ্যের স্বাদে খুব বেশি পার্থক্য নেই। তাই ব্র্যান্ডিংয়ে প্রলুব্ধ হবেন না। আপনি হয়তো ব্রান্ডের জুস বা প্রক্রিয়াজাত অন্যান্য খাবার কিনছেন। অথচ চাইলেই এগুলো বাসাতে বানানো যায়। তাহলে শুধু শুধু এজন্য কেন অতিরিক্ত টাকা খরচ করবেন?
খাবারের ব্যয় কমান
খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের একটা বড় অঙ্কের টাকা চলে যায় খাবার কেনার পেছনে। অনেক সময় রেস্তোরাঁ বা সুপার শপে গিয়ে একটু বেশিই খরচ হয়ে যায়। তাই খাবারদাবারের পেছনে নির্দিষ্ট বাজেট নির্ধারণ করে রাখুন।
আমরা অনেক সময় বাইরের খাবার খাই। কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্যয়বহুল কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। কিন্তু, কখনো ভেবে দেখেছেন এজন্য প্রতিমাসে আপনাকে অতিরিক্ত কতগুলো টাকা খরচ করতে হয়। তাই এই অভ্যাস এড়িয়ে চলুন। কোনো বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছে হলে চেষ্টা করুন বাসায় রান্না করে খাওয়ার। এতে খরচ সাশ্রয় হবে আবার পরিবারের সবার সঙ্গে সম্পর্কটাও মজবুত হবে।
আরও পড়ুন : আজ মহানবমী
গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা
আমার অনেকেই গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে সচেতন না। অথচ আমাদের সংসারের প্রতিমাসের নিয়মিত খরচের দুটি খাত গ্যাস ও বিদ্যুৎ। তাই গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহারে খুব সচেতন হতে হবে। তাহলে এখান থেকেও সংসারের কিছু খরচ কমাতে পারবেন।
পুরনো জিনিস বিক্রি
সংসারে এমন অনেক জিনিস থাকে যেগুলো কাজে লাগে না। তাই পুরনো অদরকারি জিনিসগুলো বিক্রি করে দিন। তাহলে সেখান থেকে কিছু অর্থ আসবে। আজকাল পুরনো জিনিস অহরহ বিক্রি হচ্ছে। পুরনো জিনিস কেনাবেচার অনেকগুলো অনলাইন প্লাটফর্মও আছে।
অনলাইন সাবসক্রিপশন কমানো
আধুনিক সময়ে আমরা বিনোদনের জন্য অনেকে অনলাইন প্লাটফর্মের সাবসক্রিপশন নিয়ে থাকি। কিন্তু, সেসব প্লাটফর্মে মুভি, ড্রামা বা অন্যকিছু দেখা হয় না। তাই এসব প্লাটফর্ম আনসাবসক্রাইব করে নিন। তাহলে এখান থেকে প্রতিমাসে কিছু টাকা কমাতে পারবেন। যা আপনার সংসার খরচ যোগাতে সহায়ক হবে।
কার্ডে নয়, নগদ লেনদেন
প্রতি সপ্তাহে খরচের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করুন এবং শুধু সেই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করুন। তবে, অবশ্যই নগদ টাকা খরচ করবেন। কারণ কার্ডে লেনদেন করলে আপনি নিজেও জানতে পারবেন না কত টাকা খরচ করে ফেলছেন। তাই কার্ড নয় নগদ লেনদের করুন। তাহলে সহজে বুঝতে পারবেন কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। যা আপনাকে খরচের ব্যাপারে সাবধানী হতে সহায়তা করবে।
অফারে নজর দেবেন না
এটা কিনলে ওটা ফ্রি, চলছে বিরাট ছাড়—এমন নানা বিজ্ঞাপন আমাদের চোখের সামনে আসে। কখনো কখনো অনেক প্রতিষ্ঠান মুঠোফোনে খুদে বার্তাও পাঠায়। অনেক সময় অফারের ফাঁদে পড়ে আমরা অপ্রয়োজনীয় জিনিসও কিনে ফেলি। এ ধরনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে নোটিফিকেশনগুলো বন্ধ করে দিন, পেজগুলো আনফলো করুন। আর যদি এসব করতে না চান, তাহলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ান।
ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড বাসায় রেখে যান
যতটুকু প্রয়োজন, শুধু ততটুকু নগদ টাকাই সঙ্গে নিন। কোনো ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড সঙ্গে রাখবেন না। তাহলে যতই প্রলুব্ধ হোন না কেন, দিন শেষে আপনাকে খরচ না করেই বাড়ি ফিরতে হবে। একান্তই যদি প্রয়োজনীয় কিছু কেনার পরিকল্পনা থাকে, তাহলেই কার্ড সঙ্গে নিন।
আয়ের কষ্ট মাথায় রাখুন
হঠাৎ কিছু কেনার ইচ্ছা হতেই পারে। তখন ভাবুন, এই পরিমাণ টাকা আয় করতে আপনাকে কত ঘণ্টা কাজ করতে হবে। ধরা যাক, ঘণ্টায় আপনি ২০০ টাকা আয় করেন। তাহলে দুই হাজার টাকা আয় করতে কষ্ট করতে হয়েছে ১০ ঘণ্টা। অতএব হুট করে দুই হাজার টাকার কিছু কেনার আগে এই হিসাবটা মাথায় রাখুন। এই ভাবনা আপনাকে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে নিরুৎসাহিত করবে।
আরও পড়ুন :নতুন পে-স্কেল নিয়ে যে সুখবর দিলেন অর্থ উপদেষ্টা
ঋণ বা সঞ্চয়ে মন দিন
ঋণ করে কিনলে বা সঞ্চয় থেকে খরচ হলে সেটা পূরণ করতে কত দিন সময় লাগতে পারে, হিসাব করুন। নিজের জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। ধরা যাক, আপনি ২০ হাজার টাকা জমিয়েছেন। মনে মনে ঠিক করুন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা জমাবেন, এক বছরের মধ্যে এক লাখ টাকা জমাবেন। এভাবে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোতে থাকুন। প্রয়োজনে আপনার লক্ষ্যটা লিখে মানিব্যাগে রাখুন। যেন মানিব্যাগ খুললেই লক্ষ্যটা মনে পড়ে।
খুচরা পয়সা জমান
বাড়িতে একটি মাটির ব্যাংক থাকলে অনেক সময় টাকা জমানো সহজ হয়। খুচরো টাকাগুলো মানিব্যাগে নিয়ে না ঘুরে মাটির ব্যাংকে জমা রাখুন। এতে বড় নোট ভাঙানোর প্রবণতা কমবে।
‘শূন্য খরচের দিন’
সপ্তাহে এক দিন বা দুদিনকে বানান ‘শূন্য খরচের দিন’। অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট দিনে আগে নির্ধারিত বাজেটের বাইরে কোনো টাকা ব্যয় করবেন না। সম্ভব হলে পুরোটা দিন কোনো খরচ না করে কাটান।
ঢাকা ডেস্ক 















