পাহাড়ে বর্ষায় প্রকৃতির রূপ উপভোগের অনেক সুন্দর ও মনোরম পরিবেশের নাম রাঙ্গামাটি জনপদ। যেখানে সবুজ পাহাড়, নীল কাপ্তাই হ্রদ, আর মেঘে ঢাকা আকাশ একাকার হয়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
রাঙ্গামাটিতে প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য প্রকাশ পায় বর্ষায়ই।
তাই প্রকৃতিপ্রেমী কিংবা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়রা জেনে নিন কীভাবে রাঙ্গামাটি আসবেন, এসে কী দেখবেন, কোথায় থাকবে, কী খাবেন, কত খরচ পড়বে। প্রথমে জেনে নেয়া যাক কী দেখবেন-
সুবলং ঝরনা: বর্ষার রাণী
কাপ্তাই হ্রদ ঘুরতে গেলে যেই স্থানটি না দেখলেই নয়, তা হলো সুবলং ঝরনা। শহর থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার বোট যাত্রার পরেই পৌঁছে যাবেন পাহাড়ের বুক চিড়ে ঝরে পড়া সুবলং ঝরনায়। বর্ষায় যখন ঝরনার পানি টইটুম্বুর, তখনই এর প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
এখানকার নৌপথকে স্থানীয়রা আদর করে ডাকে ‘হালংবে’ নামে। বোট ভাড়া পড়বে ২২০০ থেকে ৩৫০০ টাকার মধ্যে (১ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত), যেখানে মধ্যাহ্নভোজের জন্য চালক নিয়ে যেতে পারেন পেদাটিংটিং, চাংপাং বা মারমেট রেস্টুরেন্টে- যেখানে পাওয়া যায় বাংলা ও পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী খাবার।
বিলাইছড়ি: ঝরনার জনপদ
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলা এখন পরিচিত ‘ঝরনার উপজেলা’ নামে। গাছকাটা, ন কাটা ও ধূপপানি ঝরনা- এই তিনটি এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ঝরনা, যেগুলো বর্ষাকালে জীবন্ত হয়ে ওঠে। তবে এই ঝরনা ভ্রমণে গেলে পরিশ্রমী হতে হবে আপনাকে, কারণ যেতে হয় দুর্গম পাহাড়ি পথে।
রাঙ্গামাটি সদর অথবা কাপ্তাই উপজেলা থেকে বোটে যাওয়া যায়; খরচ ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা।
বিলাইছড়িতে সাধারণ হোটেলে থাকতে পারবেন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। জেলা পরিষদের রেস্টহাউজ, উপজেলা প্রশাসনের নীলাদ্রী রিসোর্টেও থাকতে পারবেন, তবে আগেই বুকিং করে নিতে হবে।
আরও পড়ুন : কোন বয়স থেকে নামাজ শুরু করা উচিত?
বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত পলওয়েল পার্ক শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এক করুণ ভালোবাসার স্মৃতি বহন করে। আমেরিকা প্রবাসী দম্পতি আলাউদ্দিন-লিমা হানিমুনে এসে কাপ্তাই হ্রদে ঝড়ে বোটডুবিতে নিখোঁজ হন।
তৃতীয় দিনে তাদের মরদেহ ভেসে ওঠে পলওয়েল পার্কের কাছে, আলিঙ্গনাবস্থায়।
এই প্রেমগাঁথা থেকে নির্মিত হয় ‘লাভ পয়েন্ট’। এখানে রয়েছে সুইমিং পুল, শিশুর রাইড, ৯ডি মুভি থিয়েটার এবং থাকার জন্য কটেজ, যার ভাড়া ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা।
সাজেক: মেঘের রাজ্য
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় মেঘের রাজ্যখ্যাত সাজেকের অবস্থান। যেখানে সারা বছরই পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে। যদিও সাজেক রাঙ্গামাটি জেলায়।
কিন্তু যাতায়াত করতে হয় পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির মধ্য দিয়ে। যেখানে মেঘ ছুঁয়ে যায় কটেজের বারান্দা, কখনো কখনো ঢুকে পরে রুমের ভেতরও।
অথবা কংলাক পাহাড় থেকে সূর্যোদয় দেখেন পর্যটকরা। সাজেকে কটেজ রয়েছে প্রায় ৯০টি। যেখানে কটেজ ভেদে ভাড়া ৩ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। আর খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যেতে গাড়ির আকার ভেদে খরচ হয় ৪ থেকে ১২ হাজার টাকা।
মুগ্ধতার সড়ক: প্রকৃতির আঁকা রাস্তা
পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে গেছে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এক মনোরম সড়ক। যার একপাশে বিস্তৃত কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি, আর অন্য পাশে দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড়।
এই সড়কে ভ্রমণের সময় পর্যটকরা গাড়িতে বসেই একসঙ্গে উপভোগ করতে পারেন পাহাড় ও হ্রদের অপূর্ব সৌন্দর্য।
প্রকৃতির এমন মনকাড়া রূপ দেখে অনেকেরই মনে হয়, যেন স্রষ্টা নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন এই দৃশ্যপট। আর তাই স্থানীয়রা আদর করে এই সড়ককে ডাকেন ‘মুগ্ধতার সড়ক’ নামে।
এই সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু আকর্ষণীয় রিসোর্ট, যেখানে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা। চাইলে আপনি তাবুতেও রাত কাটাতে পারেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে।
কাপ্তাই হ্রদ: নীল জলের স্বর্গ
৭২৫ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত কাপ্তাই হ্রদ রাঙ্গামাটির প্রাণ। শহরের ফিশারিঘাট, ঝুলন্ত সেতু ঘাট, রিজার্ভ বাজার বা পলওয়েল পার্ক ঘাট থেকে মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় ঘণ্টা-প্রতি বোট ভাড়া করে হ্রদের নীল জলে নৌ-ভ্রমণে বের হতে পারেন।
বোটে চড়ে সবুজ পাহাড় আর মেঘের খেলা দেখতে দেখতে এক অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন আপনি।
থাকার জায়গা: রিসোর্ট ও হোটেল
রাঙ্গামাটিতে ভ্রমণ মানেই শুধু প্রকৃতি দেখা নয়, বরং সেই প্রকৃতির মাঝে রাত কাটিয়ে তার অনন্য সৌন্দর্য আরও গভীরভাবে অনুভব করা।
হ্রদের নীল জলরাশি, সবুজ পাহাড় আর নিরিবিলি পরিবেশ- সব মিলিয়ে এখানে থাকার অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
রাঙ্গামাটিতে এমন অনেক রিসোর্ট ও আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেখানে আপনি নিজের পছন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য ও বাজেট অনুযায়ী রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা নিতে পারেন।
আরও পড়ুন :ভালো চাকরি পেতে যে আমল করবেন
হাউজ বোট: ভাসমান বাড়ি
গেল কয়েক বছরের মধ্যে রাঙ্গামাটির পর্যটন শিল্পে যুক্ত হয়েছে হাউজ বোট। এখানে বর্তমানে ১২টি হাউজবোট রয়েছে। প্রতিটি হাউজবোটেই রয়েছে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা।
বোটগুলো ঘুরে বেড়ায় হ্রদের বুকে। প্রতিটি বোটই যেন এক একটি ভাসমান বাড়ি।
এই বোটগুলোতে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা। বিভিন্ন প্যাকেজে এই বোটে কাটানো যায় রাত। যেখানে জনপ্রতি খরচ হয় ৭ হাজার টাকা করে।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে সরাসরি এসি ও নন-এসি বাসে রাঙ্গামাটি পৌঁছানো যায়। বাসবেদে ভাড়া ৮০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে।
ঢাকা ডেস্ক 









