১৬ জুলাই বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন কোটা আন্দোলনে অংশ নেওয়া আবু সাঈদ। ওই ঘটনার পর আন্দোলন বেগবান হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাস্তায় নেমে আসেন বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষ। পুলিশের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লোকজনও তাদের হটাতে রাস্তায় নামে। ফলে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে দেশ। পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিরোধীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। প্রতিদিনই লাশ পড়তে থাকে। সরকার কারফিউ জারি করে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। সেনাবাহিনী মাঠে নামানো হয়। তবে তারা অস্ত্র ব্যবহার করেনি। তারা অন্তত সরকার টেকাতে রক্তের হলিখেলায় মেতে ওঠেনি। এক পর্যায়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে সামরিক বিমানে ভারতে চলে যান। পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে অন্তত ১৪০০ মানুষের প্রাণহানি হয় বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মধ্য দিয়ে ধরেই নিয়েছিলাম রক্ত ঝরানোর রাজনীতি শেষ। মানুষ হত্যার রাজনীতি শেষ। কিন্তু আমার আশার গুড়ে বালু পড়তে সময় লাগেনি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশে সহিংতা বেড়ে যায়। মব জাস্টিসের নামে মানুষ হত্যার নেশায় মেতে উঠে এক শ্রেণীর নরপশু। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে গত ৯ মাসে মব জাস্টিসের শিকার হয়ে অন্তত ১৩১ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত দেড়শ জন। এর বাইরেও বিপুল মানুষ খুন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও খুন-খারাবি থেমে নেই।
বছর ঘুরে ফের এসেছে জুলাই। ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এদিন সেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মার্চ টু গোপালগঞ্জ কর্মসূচি ঘিরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং তাদের সহযোগীরা মাঠে নামে। এনসিপির নেতারা সেখানে যাওয়ার আগেই তারা সমাবেশ মঞ্চ ভেঙে ফেলে। তারা পুলিশের গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ভাংচুর করা হয় ইউএনও’র গাড়ি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সহায়তায় এনসিপির নেতারা সমাবেশ করে মাদারীপুর যাওয়ার পথে টেকেরহাটে হামলা করে আওয়ামী লীগের লোকজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে চারজন নিহত হয়। গুলিবিদ্ধ হয় ৯ জন। তাদের একজন শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৫-এ।
আরও পড়ুন : ইরান ও হরমুজ প্রণালী
এখন প্রশ্ন হলো গোপালগঞ্জের এই সহিংসতা ঠেকানো যেত কি না? অবশ্যই ঠেকানো যেত। প্রশাসন এবং এনসিপি সতর্ক হলে অবশ্যই এই সংঘাত প্রাণহানি ঠেকানো যেত।
ভুলে গেলে চলবে না গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান। সেখানেই তার সমাধি। দেশের ৬৩টি জেলাও যদি আওয়ামী লীগশূন্য হয়ে যায়, তারপরও গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ থাকবে এবং বেশ শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। গোপালগঞ্জ হলো ‘আওয়ামী লীগের দুর্গ’।
গত ১ জুলাই ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি দেয় এনসিপি। এরই অংশ হিসেবে ১৬ জুলাই ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে তারা। অন্যান্য জেলায় ‘জুলাই পদযাত্রা’ হলেও গোপালগঞ্জের ক্ষেত্রে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কেন? এই নামকরণের মধ্য দিয়ে তারা সচেতনভাবে গোপালগঞ্জকে আলাদা করেছে।
কর্মসূচির আগের রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম লেখেন, ‘আগামীকাল ১৬ জুলাই মার্চ টু গোপালগঞ্জ।’ এদিন বিকালে দলটির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম ফেসবুকে লেখেন, ‘১৬ জুলাই মার্চ টু গোপালগঞ্জ!’ রাতে তিনি আরেকটি পোস্ট দিয়ে লেখেন, ‘বিপ্লবের সহযোদ্ধারা, ধূমকেতুর মতো ছুটে আসুন। আগামীকাল সকাল ১১টায় গোপালগঞ্জ শহরে দেখা হচ্ছে ইনশাআল্লাহ।’ ঘটনার দিন বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এনসিপির সিনিয়র নেতা আরিফুর রহমান তুহিন ফেসবুকে পোস্ট দেন ‘পদযাত্রা অথবা বুলডোজার।’
এখন প্রশ্ন হলো- পদযাত্রা অথবা বুলডোজার কেন? বুলডোজার দিয়ে তারা কী ভাঙার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা সহজেই অনুমেয়। কারণ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এনসিপি হয়তো বঙ্গবন্ধুর সমাধি গুঁড়িয়ে দেয়ার ইঙ্গিত করছেÑ এমনটা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ মনে করছে। এনসিপি কেন বুলডোজারের প্রসঙ্গ টানলো? ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি নামকরণে উসকানি ছিল বলেই রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন।
যে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, সেই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী তরুণদের দল যখন বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার জন্মস্থান তথা আওয়ামী লীগের দুর্গ গোপালগঞ্জে কোনো কর্মসূচি নিয়ে যাবে, সেখানে যে সংঘাত বা হামলা-পাল্টা হামলা হবেÑ এটি অস্বাভাবিক নয়। এনসিপি নেতারা কী জানতেন যে, তাদের গোপালগঞ্জের কর্মসূচি দেশের অন্য এলাকাগুলোর মতো হবে না? সেখানে হামলা বা বড় ধরনের সংঘাত হতে পারে? তারা সেখানে কর্মসূচি নিয়ে গেলেন সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য? কোণঠাসা আওয়ামী লীগ গোপালগঞ্জে কী অবস্থায় আছে, সেটি পরীক্ষা করার জন্য? গোপালগঞ্জ যে আওয়ামী লীগের দুর্গ- এই মিথ ভেঙে দেয়াও হতে পারে তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য। সেটা সংঘাত-সহিংসতা নয়, বরং আওয়ামী লীগের চেয়ে উন্নত রাজনীতি দিয়ে জনগণের মন জয় করাটাই যৌক্তিক। এনসিপি যদি ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ না বলে অন্য জেলার মতো গোপালগঞ্জেও ‘জুলাই পদযাত্রা’ নামে কর্মসূচি করতো এবং বুলডোজার প্রসঙ্গটি না আনতো; তাহলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি না হতো যে, তারা বঙ্গবন্ধুর সমাধি গুঁড়িয়ে দেবে (যে হুমকি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙার পর থেকেই দেয়া হচ্ছিল)। তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা সহিংস হয়ে উঠতো না। তা-ই বলে আওয়ামী লীগ যে সহিংসতার সূত্রপাত ঘটালো, তাকে বৈধতা দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বরং উসকানি সত্ত্বেও এনসিপি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষ করে ফিরতে পারলো আওয়ামী লীগের জন্য সহনশীলতার পরিচয় হতো।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
আব্দুর রহিম 









