একটি সংকীর্ণ জলপথ, অথচ কতটুকুই বা সংকীর্ণ! মাত্র ২১ মাইল চওড়া। কিন্তু এই সরু প্রণালীই মধ্যপ্রাচ্য নামক অগ্নিগর্ভ অঞ্চলের হৃদস্পন্দন। এখান দিয়েই দৈনন্দিন প্রবাহিত হয় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। যেন এক অনারক্ষিত শিরা, যার মাঝ দিয়ে জীবনের রক্তধারা বয়ে চলে। যার নাম তেল।
ইরানের কৌশলগত অস্ত্রাগারে সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে তীব্র অস্ত্রটি হলো এই হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই জলপথ শুধু ইরানের একার নয়,তবে তার ভূরাজনৈতিক কব্জায় আবদ্ধ। কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, এমনকি ইরাকের মতো তেলভাণ্ডারসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর জন্যও এই প্রণালী একমাত্র ভরসা। এই পথ বন্ধ মানেই কোটি কোটি ব্যারেল তেল আটকে যাওয়া, বিশ্ববাজারে দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়া, এবং বিশ্বের জ্বালানী অর্থনীতিতে তীব্র কম্পন।
ইরান জানে, এই প্রণালী বন্ধ করার হুমকি একরকম পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছায়া বিস্তার করতে পারে। অথচ তারা সেই অস্ত্রকে ব্যবহার করছে না। কেন?
কারণ এই জলপথ কেবল শত্রুদেরই নয়, মিত্রদেরও জীবনরেখা। হরমুজ প্রণালী যদি ইরান একতরফাভাবে বন্ধ করে দেয়, তবে তার প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো মুহূর্তেই শত্রুতে পরিণত হবে। এখনো পর্যন্ত যারা ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দ্বিধা করছে,সৌজন্যে কূটনৈতিক স্বার্থ,তারা তখন আর নীরব থাকবে না। বিশেষ করে সৌদি আরব, যাদের তেল রপ্তানির বিশাল অংশ নির্ভর করে এই পথের উপর, তখনই রিয়াদ নিজের অস্ত্রাগার খুলে বসবে। কুয়েত, বাহরাইন, আমিরাতসহ সবার চোখ তখন শুধু ইসরায়েল বা আমেরিকার দিকে নয়, বরং ইরানকেও শত্রু তালিকায় তুলে দেবে।
আর আমেরিকা? সে তো বহু আগেই সেখানে উপস্থিত, তীর গোঁজে অপেক্ষমাণ। এই জলপথে আমেরিকার নৌবাহিনী চিরকাল পাহারায় থাকে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের চেষ্টা মাত্রই হবে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা। তখন ইরানের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে আরও একাধিক আক্রমণ।সাইবার থেকে শুরু করে সামরিক, অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে কূটনৈতিক চাপে নিষ্পেষণ।
বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে যার অবস্থান
তবু ব্যাপারটা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালী বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিধর চীন, তেলনির্ভর ভারত, শিল্পভিত্তিক জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবাই জ্বালানীর জন্য নির্ভর করে এই পথের উপর। একবার বন্ধ হলে চীনের কারখানায় আগুন জ্বলবে না, বরং নিভে যাবে সমস্ত চিমনি। সেই চীন, যে ইরানের অন্যতম বন্ধু, সেও তখন তেল না পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে পারত, লোহিত সাগরের হুথি মিলিশিয়াদের সহযোগিতায় পুরো অঞ্চলকে অর্থনৈতিক অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারত। কিন্তু তারা জানে, যুদ্ধ একবার শুরু হলে কার রক্ত আগে ঝরবে, তা কেউ জানে না।
এই ভূরাজনীতি যেন দাবার খেলা। ঘুঁটি সাজানো, চাল দেওয়া হয় কৌশলে, কিন্তু কোনও চালই যেন চূড়ান্ত নয়। কারণ, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা মানেই নিজের শ্বাসনালী চেপে ধরা, এই সত্যটা ইরান ভালো করেই জানে। তাই এখনো তারা তেলের ধারা বইতে দিচ্ছে। কারণ হরমুজ যদি থেমে যায়, তাহলে কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্ব থেমে যাবে। আর সেই জড়তা থেকে উঠে দাঁড়ানোর আগে হয়তো বহু ধ্বংসস্তুপের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হবে, যার মাঝে ইরান নিজেও হারিয়ে যেতে পারে।
তাই, হরমুজ প্রণালী তাদের অস্ত্র, কিন্তু তা এখনো খাপছাড়া হয়নি। তা এখনো একটি বেতাল কবিতা। যার অন্ত্যমিল এখনো ঠিক হয়নি, যার সমাপ্তি এখনো অনিশ্চিত।
ঢাকা ডেস্ক 









