দেশের অপরাধজগতে নতুন আতঙ্ক ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ‘পেন গান’ বা ‘কলম অস্ত্র’। দুর্ধর্ষ চরমপন্থি সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের হাতে বেশ আগেই পৌঁছে গেছে এই আগ্নেয়াস্ত্র। এটি বেশি ব্যবহার হয় টার্গেট কিলিংয়ে। আকারে ছোট হওয়ায় এটি পকেটে বা ব্যাগে সহজেই লুকিয়ে রাখা যায়। ফলে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছে চাহিদার তুঙ্গে এখন ‘পেন গান’।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে এই ক্ষুদ্র মারণাস্ত্র। যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বেশি ঢুকছে পেন গান। সহজে বহনযোগ্য ও লুকিয়ে রাখা যায় বলে অপরাধীদের কাছে এটি জনপ্রিয়। জানা যায়, ভারতের ছত্তিশগড়ের মাওবাদী বিদ্রোহীদের নিজস্ব কারিগরি দল কিছু পেন গান তৈরি করে থাকে। এছাড়া অন্যান্য দেশেও তৈরি হয় অত্যাধুনিক এই অস্ত্র।
রাজধানী ঢাকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অপরাধজগতের আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অবৈধ অস্ত্রের বাজারে ‘পেন গান’ বেশি পাওয়া যায়। বেশকিছু টার্গেট কিলিংয়ে এই অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। রাজধানীর তাঁতীবাজারের প্রসন্ন পোদ্দার লেন এলাকায় হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে নেমে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ প্রথমবার একটি পেন গান উদ্ধার করে।
গ্রেফতার করে সোহেল ওরফে কাল্লু ও সাইমন হোসেন নামের দুই সন্ত্রাসীকে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা ওই পেন গান দিয়েই রাসেল নামের এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে গুরুতর আহত করে। এরপর থেকেই দেশব্যাপী আলোচনার তুঙ্গে ক্ষুদ্র এই মারণাস্ত্র। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিযানে নতুন এই অস্ত্র উদ্ধার ডিবির বড় সাফল্য হিসেবে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, ডিবি ভয়ঙ্কর আগ্নেয়াস্ত্র ‘পেন গান’ উদ্ধারের আগে এ বিষয়ে কেউ যানতেন না। এখন সবাই সচেতন হবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে দেশে এ অস্ত্রের মজুদ ধ্বংস হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, উদ্ধার করা পেন গান সম্পূর্ণরূপে একটি ইউনিক অস্ত্র। অপরাধীরা এ ধরনের অস্ত্র এর আগে অপরাধ কার্যক্রমে ব্যবহার করেছে মর্মে আমাদের কাছে তথ্য ছিল না। এ ধরনের কোনো মামলা এর আগে আমরা পাইনি। সুতরাং এটির প্রতি আমাদের আগ্রহটা বেশি। এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে আমরা কাজ করছি।
এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, খুবই ছোট্ট একটি কলমসদৃশ অস্ত্র। এটির উৎস খুঁজে বের করা, এটার অবৈধ কারবারির সঙ্গে কাদের সংশ্লিষ্টতা আছে এবং কোথা থেকে কীভাবে কোন রুটে আসে-প্রতিটি বিষয়ে আমরা তদন্তে মনোনিবেশ করেছি। আমরা আশাবাদী পেন গানের রুট আমরা খুঁজে বের করতে পারব। যারা এটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের আমরা আইনের আওতায় আনব। এ ধরনের অস্ত্র অপরাধীরা আগে ব্যবহার করেছে-এমন কোনো অভিযোগ বা মামলা আমরা অতীতে পাইনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া পেন গানের ফরেনসিক করাতে হবে।
ফরেনসিক করে এটির কার্যকারিতা কতটুকু, এটা দিয়ে কতটুকু দূরত্ব থেকে গুলি করলে কী হয়, এটির বোর, ব্যারেল, বিভিন্ন যে এক্সপ্লেনেশন আছে-প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে জানতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামতের জন্য পাঠানো হবে। প্রসঙ্গত, পেন গান দেখতে সাধারণ লেখার কলমের মতো, যা সহজেই পকেটে বা কলমদানিতে লুকিয়ে রাখা যায়। ফলে সন্ত্রাসীরা সহজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে পারে। এছাড়া দেশে অতীতে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের নজির না থাকায় পেন গানের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে খুব একটা তথ্য নেই। ভয়ংকর এই আগ্নেয়াস্ত্রে কলমের ক্লিপ আকৃতির অংশই ট্রিগার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এ অস্ত্র দিয়ে খুব কাছ থেকে কাউকে গুলি করলে বাঁচা কঠিন।
জানা যায়, আগ্নেয়াস্ত্র পেন গান প্রথম গোয়েন্দাদের নজরে আসে ২০২৪ সালে। ওই বছরের ১৬ মে গোয়েন্দা পুলিশ সাভার থেকে গ্রেফতার করে খুলনা অঞ্চলের একসময়ের দুর্ধর্ষ চরমপন্থি সন্ত্রাসী শিমুল ভূঁইয়াকে। তার বিষয়ে তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অস্ত্র কারবারে জড়িত শিমুল ভূঁইয়া। তার মোবাইল ফোন থেকে পেন গানের ভিডিও উদ্ধার করা হয়। সে সময় শিমুল ভূঁইয়া গোয়েন্দাদের জানান, বাংলাদেশে পেন গানের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি অনেক রাজনৈতিক নেতাও পেন গান কিনতে চান।
এদিকে রাজধানীর তাঁতীবাজারের প্রসন্ন পোদ্দার লেন এলাকা থেকে পেন গান উদ্ধারের ঘটনায় ডিএমপির লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ব্যবসায়ী রাসেল হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি সোহেল ওরফে কাল্লু ও সাইমন হোসেনকে। অস্ত্র মামলায় আসামি করা হয়েছে সন্ত্রাসী রিপন দাশসহ অজ্ঞাত দুই থেকে তিনজনকে। পূর্বশত্রুতার জেরে মো. রাসেল নামের যে ব্যবসায়ীকে গুলি করা হয়, তিনি এখনো রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রেফতার সোহেল ওরফে কাল্লু ও সাইমন হোসেন মাদক ও অস্ত্র কারবারি। তাদের মধ্যে কাল্লু তাঁতীবাজারের জিন্দাবাহার লেন পার্কের পাশে পান-সিগারেট বিক্রি করেন। ওই ব্যবসার আড়ালে তিনি অস্ত্র কেনাবেচায় জড়িত। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উদ্ধার হওয়া পেন গানটি সোহেল ওরফে কাল্লু এক অবৈধ অস্ত্র কারবারির কাছ থেকে আনেন বিক্রির উদ্দেশ্যে।
ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে কাল্লু জানিয়েছেন, ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করলে তিনি ১০ হাজার টাকা কমিশন পেতেন। ওই অস্ত্র দিয়েই ব্যবসায়ী রাসেলকে গুলি করেন সাইমন হোসেন। রাসেলকে গুলি করার আগে কাল্লু, সাইমন ও রিপন দাশ (পলাতক) ইয়াবা সেবন করেন। তারা কৌশলে সাইমনের বাসায় ডেকে নেন রাসেলকে। চেয়ারে বসা অবস্থায় রাসেল কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুকের দিকে পেন গান তাক করে গুলি ছোড়েন সাইমন। এই চক্রের অন্য সদস্যদের হাতে আরও পেন গান থাকার আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ডিবির অভিযানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ঢাকা ডেস্ক 









