০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

মুসলিম দেশ হয়েও জর্ডান কেন ইসরায়েলের পক্ষে?

  • ঢাকা ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৭:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • 170

ব্রিজের একপাশে জর্ডান অপর পাশে ইসরায়েল। ছবি : সংগৃহীত

কল্পনা করুন, আপনি এমন একটি দেশ যেখানে আপনার একদিকে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্র, আর অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের জোরালো দাবি। এখন এই দুটি শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলা কতটা কঠিন কাজ তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনি। আর জেনে বুঝেই আপনাকে নিতে হচ্ছে সেই চ্যালেঞ্জ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন সেই দেশ? যাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে এইরকম কঠিন চ্যালেঞ্জ।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান। যে দেশটিকে চলতে হচ্ছে এমনই এক কঠিন পথে। যদিও বিশ্বের অন্যতম মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে তাদের দায়িত্ব ছিল ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, ফিলিস্তিনের পক্ষে না দাঁড়িয়ে বরং ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে তারা। কেনই বা এই অদ্ভুত কৌশলগত পরিবর্তন?

পুরো বিশ্বের মনোযোগ এখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দিকে। আর এই পরিস্থিতিতে মুসলিম প্রধান আরব দেশ জর্ডানের ভূমিকা ঘিরে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। বিশেষ করে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে আমেরিকা ও ব্রিটেনের পাশাপাশি বেশ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল জর্ডান। যদিও জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘তারা নিজের দেশকে রক্ষা করার অংশ হিসেবে ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করেছে, ইসরায়েলকে সাহায্য করার জন্য নয়।’

কিন্তু জর্ডানের এই বিবৃতি অনেকের কাছে ‘ভারসাম্য রক্ষার’ কৌশল হিসেবেই মনে হচ্ছে। জর্ডান চায় না হামাস, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতে ‘ক্রসফায়ারে’ পড়তে। কারণ পর্দার আড়ালে জর্ডানের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্কও একেবারে খারাপ নয়।

আরও পড়ুন : ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দেবে না ইরান

জর্ডান ও ইসরায়েলের সম্পর্ক কি তাহলে বন্ধুত্ব নাকি কৌশলগত? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের যেতে হবে একটু পিছনের দিকে। ১৯৯৪ সালে একটি শান্তি চুক্তি হয় জর্ডান ও ইসরায়েলের মধ্যে, যেখানে জর্ডান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চারটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল জর্ডান। তবে শান্তিচুক্তির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে শক্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি, ইসরায়েলি মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, ইরানের হামলা প্রতিহত করতে জর্ডানের ভূমিকা ইসরায়েলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে অনেক ইসরায়েলি আবার এই সহায়তা দেখে বিস্মিতও হয়েছেন। একদিকে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত জর্ডান, অন্যদিকে ইসরায়েলের সাথেও রয়েছে তাদের গভীর থেকে গভীরতর সম্পর্ক।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভৌগলিক কারণে জর্ডান এমন এক অবস্থানে রয়েছে। যেখানে গাজাকে কেন্দ্র করে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এই দেশের ওপরেই। তাই একদিকে তাদের আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে প্রচুর ফিলিস্তিনি শরণার্থী থাকার কারণে ফিলিস্তিনের প্রতিও সমর্থন দেখানোও জরুরি। তাই তারা নিয়েছে এই কৌশলগত অবস্থান।

আরও পড়ুন : ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলো জাপান

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক এমিলি হোকায়েমের মতে, জর্ডানের পরিস্থিতি জটিল। তারা একদিকে ইসরায়েল ও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায়, অন্যদিকে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন বজায় রাখার চাপও রয়েছে।

এ বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষক এর মতে, জর্ডান আসলে কোনো এক পক্ষের চেয়ে নিজেদের দেশের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বেশি আগ্রহী। কারণ জর্ডান এমন একটি সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছে, যেখানে একপাশে আছে ইসরায়েল ও আমেরিকার সহযোগিতা, আর অন্যপাশে আছে মুসলিম জনগণের সমর্থন। জর্ডানের সাবেক রাজা বাদশা আবদুল্লাহর সময় থেকে ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক বরাবরই মিশ্র।

জর্ডানের এই দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। অনেকেই বলছেন, জর্ডান তার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার জন্য এমন জটিল অবস্থান নিচ্ছে। যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে না গিয়ে বরং তারা নিজের দেশকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে।

ইসরায়েলের সাথে জর্ডানের সম্পর্ক এখন কেবলই কৌশলগত সহযোগিতা নয়; এটি এক জটিল রাজনৈতিক খেলার অংশ, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই নিখুঁত হিসাব কষে নেয়া হচ্ছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, এই পথ একেবারে সহজ হবে না জর্ডানের জন্য।

 

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সেভ করুন

সর্বাধিক পঠিত

মিরপুরে ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

মুসলিম দেশ হয়েও জর্ডান কেন ইসরায়েলের পক্ষে?

সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৭:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

কল্পনা করুন, আপনি এমন একটি দেশ যেখানে আপনার একদিকে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্র, আর অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের জোরালো দাবি। এখন এই দুটি শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলা কতটা কঠিন কাজ তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনি। আর জেনে বুঝেই আপনাকে নিতে হচ্ছে সেই চ্যালেঞ্জ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন সেই দেশ? যাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে এইরকম কঠিন চ্যালেঞ্জ।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান। যে দেশটিকে চলতে হচ্ছে এমনই এক কঠিন পথে। যদিও বিশ্বের অন্যতম মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে তাদের দায়িত্ব ছিল ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, ফিলিস্তিনের পক্ষে না দাঁড়িয়ে বরং ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে তারা। কেনই বা এই অদ্ভুত কৌশলগত পরিবর্তন?

পুরো বিশ্বের মনোযোগ এখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দিকে। আর এই পরিস্থিতিতে মুসলিম প্রধান আরব দেশ জর্ডানের ভূমিকা ঘিরে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। বিশেষ করে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে আমেরিকা ও ব্রিটেনের পাশাপাশি বেশ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল জর্ডান। যদিও জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘তারা নিজের দেশকে রক্ষা করার অংশ হিসেবে ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করেছে, ইসরায়েলকে সাহায্য করার জন্য নয়।’

কিন্তু জর্ডানের এই বিবৃতি অনেকের কাছে ‘ভারসাম্য রক্ষার’ কৌশল হিসেবেই মনে হচ্ছে। জর্ডান চায় না হামাস, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতে ‘ক্রসফায়ারে’ পড়তে। কারণ পর্দার আড়ালে জর্ডানের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্কও একেবারে খারাপ নয়।

আরও পড়ুন : ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দেবে না ইরান

জর্ডান ও ইসরায়েলের সম্পর্ক কি তাহলে বন্ধুত্ব নাকি কৌশলগত? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের যেতে হবে একটু পিছনের দিকে। ১৯৯৪ সালে একটি শান্তি চুক্তি হয় জর্ডান ও ইসরায়েলের মধ্যে, যেখানে জর্ডান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চারটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল জর্ডান। তবে শান্তিচুক্তির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে শক্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি, ইসরায়েলি মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, ইরানের হামলা প্রতিহত করতে জর্ডানের ভূমিকা ইসরায়েলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে অনেক ইসরায়েলি আবার এই সহায়তা দেখে বিস্মিতও হয়েছেন। একদিকে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত জর্ডান, অন্যদিকে ইসরায়েলের সাথেও রয়েছে তাদের গভীর থেকে গভীরতর সম্পর্ক।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভৌগলিক কারণে জর্ডান এমন এক অবস্থানে রয়েছে। যেখানে গাজাকে কেন্দ্র করে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এই দেশের ওপরেই। তাই একদিকে তাদের আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে প্রচুর ফিলিস্তিনি শরণার্থী থাকার কারণে ফিলিস্তিনের প্রতিও সমর্থন দেখানোও জরুরি। তাই তারা নিয়েছে এই কৌশলগত অবস্থান।

আরও পড়ুন : ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলো জাপান

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক এমিলি হোকায়েমের মতে, জর্ডানের পরিস্থিতি জটিল। তারা একদিকে ইসরায়েল ও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায়, অন্যদিকে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন বজায় রাখার চাপও রয়েছে।

এ বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষক এর মতে, জর্ডান আসলে কোনো এক পক্ষের চেয়ে নিজেদের দেশের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বেশি আগ্রহী। কারণ জর্ডান এমন একটি সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছে, যেখানে একপাশে আছে ইসরায়েল ও আমেরিকার সহযোগিতা, আর অন্যপাশে আছে মুসলিম জনগণের সমর্থন। জর্ডানের সাবেক রাজা বাদশা আবদুল্লাহর সময় থেকে ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক বরাবরই মিশ্র।

জর্ডানের এই দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। অনেকেই বলছেন, জর্ডান তার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার জন্য এমন জটিল অবস্থান নিচ্ছে। যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে না গিয়ে বরং তারা নিজের দেশকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে।

ইসরায়েলের সাথে জর্ডানের সম্পর্ক এখন কেবলই কৌশলগত সহযোগিতা নয়; এটি এক জটিল রাজনৈতিক খেলার অংশ, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই নিখুঁত হিসাব কষে নেয়া হচ্ছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, এই পথ একেবারে সহজ হবে না জর্ডানের জন্য।