০৯:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী: অমর অক্ষয় খালেদা জিয়া

  • ঢাকা ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৪২:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • 209

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর, বেদনাবিধুর এবং তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে গত ৩০ ডিসেম্বর। গণতন্ত্রের আপসহীন সৈনিক, মা–মাটি ও মানুষের নেত্রী, তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অযুত কোটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন অনন্তের পথে—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর প্রয়াণ শুধু একটি রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয় বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি বলে আমি মনে করি। যেখানে রচিত হয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ, নেতৃত্ব ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দৃঢ়তার এক অনন্য ইতিহাস। তার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার।

বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের এক সুদৃঢ় কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন নিপীড়িত মানুষের আশ্রয় আর জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্যের প্রতীক। ব্যক্তিগত জীবনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে—যার প্রভাব চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি ছিলেন একজন গৃহবধূ—রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি পড়ে যায় নেতৃত্ব সংকটে। সেই সংকটময় সময়ে, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং শেষে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজনীতিতে আসার দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মুসলিমপ্রধান, পুরুষশাসিত সমাজে একজন গৃহবধূর এভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো ছিল যুগান্তকারী ঘটনা । এটি শুধু বাংলাদেশ নয়। বিশ্বের ইতিহাসেই এটি একটি বিরলতম ঘটনা। সত্যিকার অর্থে তিনি এমন এক সময়ে স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যখন পুরুষশাসিত সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তাঁর আপসহীনতা। ১৯৮৩ সালে তিনি স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭–দলীয় ঐক্যজোট, যা পরবর্তীকালে ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়। দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’—যে পরিচয় আজও তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়। রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার, হুমকি—সবকিছুর মধ্যেও তিনি ছিলেন অটল। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি অভাবনীয় জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। বেগম খালেদা জিয়া হন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী—যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক অনন্য কৃতিত্ব।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অপরাজেয় নেত্রী। গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিটি নির্বাচনী লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যে কটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছেন, প্রতিবারই তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি কখনো পরাজয় বরণ করেননি।

আপসহীন আন্দোলনের নেত্রী হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় খালেদা জিয়া ছিলেন বাস্তববাদী ও পরিস্থিতিবোদ্ধা। তিনি সংলাপ ও সমঝোতার রাজনীতিকে কখনো পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান তারই প্রমাণ। শুরুতে বিএনপি একমত না হলেও জনদাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি সেই ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ৭–দলীয়, ৪–দলীয় এবং পরবর্তীকালে ২০–দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বাংলাদেশে জোটভিত্তিক রাজনীতির সফল প্রয়োগে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা তাঁকে একটি বৃহত্তর জাতীয় নেত্রীতে পরিণত করেছিল।

২০০৭ সালের এক-এগারোর পর খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারে নেমে আসে চরম সংকট। সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি ও তাঁর দুই পুত্র গ্রেপ্তার হন। দল ভাঙার চেষ্টা, তাঁকে বিদেশে পাঠানোর ষড়যন্ত্র—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর সেই উচ্চারণ—“এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু”—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃঢ়তার উদাহরণ হয়ে আছে।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৪১ বছরের স্মৃতি বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদ, অবরুদ্ধ জীবন, কারাবাস, সন্তান হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডির গল্প। তবু তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। বরং বারবার বলেছিলেন, দেশবাসীই তাঁর প্রকৃত স্বজন।

দীর্ঘ আন্দোলন, ক্ষমতা, নিপীড়ন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া শেষ জীবনে এসে দল-মত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধায় সিক্ত হন এবং জাতীয় নেত্রীতে পরিণত হন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পেয়ে তিনি তরুণদের উদ্দেশে যে বার্তা দেন—“ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি”—তা তাঁকে নতুনভাবে ‘ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রকৃতপক্ষে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, দীর্ঘ সময়ের নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

শেষ কথা:
বেগম খালেদা জিয়া দৈহিকভাবে চলে গেলেন। কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে—মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী হিসেবে। গণতন্ত্র, আপসহীনতা, ত্যাগ ও নেতৃত্বের যে মানদণ্ড তিনি স্থাপন করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য এক অনিবার্য পাঠ হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ ও দৃঢ়তা অমর-অক্ষয়। বস্তুতপক্ষে একজন খালেদা জিয়ার কোনো মৃত্যু নেই। তিনি অনন্য আদর্শের প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে।

সূত্র: মানবজমিন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহসান হাবিব বরুন, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সেভ করুন

সর্বাধিক পঠিত

মিরপুরে ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী: অমর অক্ষয় খালেদা জিয়া

সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৪২:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর, বেদনাবিধুর এবং তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে গত ৩০ ডিসেম্বর। গণতন্ত্রের আপসহীন সৈনিক, মা–মাটি ও মানুষের নেত্রী, তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অযুত কোটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন অনন্তের পথে—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর প্রয়াণ শুধু একটি রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয় বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি বলে আমি মনে করি। যেখানে রচিত হয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ, নেতৃত্ব ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দৃঢ়তার এক অনন্য ইতিহাস। তার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার।

বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের এক সুদৃঢ় কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন নিপীড়িত মানুষের আশ্রয় আর জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্যের প্রতীক। ব্যক্তিগত জীবনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে—যার প্রভাব চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি ছিলেন একজন গৃহবধূ—রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি পড়ে যায় নেতৃত্ব সংকটে। সেই সংকটময় সময়ে, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং শেষে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজনীতিতে আসার দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মুসলিমপ্রধান, পুরুষশাসিত সমাজে একজন গৃহবধূর এভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো ছিল যুগান্তকারী ঘটনা । এটি শুধু বাংলাদেশ নয়। বিশ্বের ইতিহাসেই এটি একটি বিরলতম ঘটনা। সত্যিকার অর্থে তিনি এমন এক সময়ে স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যখন পুরুষশাসিত সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তাঁর আপসহীনতা। ১৯৮৩ সালে তিনি স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭–দলীয় ঐক্যজোট, যা পরবর্তীকালে ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়। দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’—যে পরিচয় আজও তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়। রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার, হুমকি—সবকিছুর মধ্যেও তিনি ছিলেন অটল। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি অভাবনীয় জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। বেগম খালেদা জিয়া হন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী—যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক অনন্য কৃতিত্ব।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অপরাজেয় নেত্রী। গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিটি নির্বাচনী লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যে কটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছেন, প্রতিবারই তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি কখনো পরাজয় বরণ করেননি।

আপসহীন আন্দোলনের নেত্রী হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় খালেদা জিয়া ছিলেন বাস্তববাদী ও পরিস্থিতিবোদ্ধা। তিনি সংলাপ ও সমঝোতার রাজনীতিকে কখনো পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান তারই প্রমাণ। শুরুতে বিএনপি একমত না হলেও জনদাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি সেই ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ৭–দলীয়, ৪–দলীয় এবং পরবর্তীকালে ২০–দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বাংলাদেশে জোটভিত্তিক রাজনীতির সফল প্রয়োগে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা তাঁকে একটি বৃহত্তর জাতীয় নেত্রীতে পরিণত করেছিল।

২০০৭ সালের এক-এগারোর পর খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারে নেমে আসে চরম সংকট। সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি ও তাঁর দুই পুত্র গ্রেপ্তার হন। দল ভাঙার চেষ্টা, তাঁকে বিদেশে পাঠানোর ষড়যন্ত্র—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর সেই উচ্চারণ—“এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু”—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃঢ়তার উদাহরণ হয়ে আছে।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৪১ বছরের স্মৃতি বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদ, অবরুদ্ধ জীবন, কারাবাস, সন্তান হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডির গল্প। তবু তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। বরং বারবার বলেছিলেন, দেশবাসীই তাঁর প্রকৃত স্বজন।

দীর্ঘ আন্দোলন, ক্ষমতা, নিপীড়ন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া শেষ জীবনে এসে দল-মত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধায় সিক্ত হন এবং জাতীয় নেত্রীতে পরিণত হন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পেয়ে তিনি তরুণদের উদ্দেশে যে বার্তা দেন—“ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি”—তা তাঁকে নতুনভাবে ‘ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রকৃতপক্ষে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, দীর্ঘ সময়ের নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

শেষ কথা:
বেগম খালেদা জিয়া দৈহিকভাবে চলে গেলেন। কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে—মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী হিসেবে। গণতন্ত্র, আপসহীনতা, ত্যাগ ও নেতৃত্বের যে মানদণ্ড তিনি স্থাপন করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য এক অনিবার্য পাঠ হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ ও দৃঢ়তা অমর-অক্ষয়। বস্তুতপক্ষে একজন খালেদা জিয়ার কোনো মৃত্যু নেই। তিনি অনন্য আদর্শের প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে।

সূত্র: মানবজমিন। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহসান হাবিব বরুন, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com