০২:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হতে পারবো না’

  • ঢাকা ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:৫৭:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
  • 306

রাজধানীর পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসাইনকে যখন হত্যা করা হয় তখন সিঁড়িতে ছটফট করতে থাকেন।

ঘাতক মাহিরের ছুরিকাঘাতে আহত জোবায়েদ তার ছাত্রী ও প্রেমিকা বর্ষার কাছে শেষ মুহূর্তে বাঁচার আকুতি জানালে ওই সময় জোবায়েদের উদ্দেশ্যে বর্ষা বলে, ‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হতে পারবো না’।

নিষ্ঠুর সেই মুহুর্তে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পরেন জোবায়েদ। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান জবির এই ছাত্রদল নেতা। হত্যার পরিকল্পনায় নাম উঠে আসা জোবায়েদের ছাত্রী ও প্রেমিকা বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, বর্ষার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন তার প্রথম প্রেমিক মাহির।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবায়েদ পুরান ঢাকার বংশাল থানার নুর-বক্স লেনের একটি বাসায় ছাত্রীকে পড়াতে গিয়ে হত্যার শিকার হন। নিহত জোবায়েদ বর্ষাকে পড়াতে গিয়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমিকা বর্ষা একই সময়ে মাহির ও জোবায়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলো।

ত্রিভুজ প্রেম থেকে বের হতে নিজেই হত্যার পরিকল্পনা সাজায় বর্ষা। এই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে ছাত্রী বর্ষা- তার প্রথম প্রেমিক মো. মাহির ও তার বন্ধু ফারদিন আহমেদ আইলানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।



তিনি আরও বলেন, বর্ষা একই সময়ে তার গৃহ শিক্ষক জোবায়েদ ও মাহিরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলো। গত ২৬ সেপ্টেম্বর বর্ষার প্রথম প্রেমিক মাহির বিষয়টি নিয়ে বর্ষাকে চাপ প্রয়োগ করলে সেদিনই গৃহশিক্ষক জোবায়েদকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তারা। পরবর্তীতে মাহির ও তার বন্ধু আইলান মিলে চাকু কিনে গত ১৯ অক্টোবর বর্ষার বাসায় অবস্থান নেয়। আর বর্ষা তার শিক্ষক ও প্রেমিক জোবায়েদকে ডেকে আনেন। এরপরই বর্ষার বাসার সিঁড়ি রুমে জোবায়েদকে বলা হয় বর্ষার থেকে সরে আসতে। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে জোবায়েদকে গলায় পোঁচ দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় তাদের তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, আমরা তদন্তে পেয়েছি মাহির একই বাসায় ভাড়া থাকতো। মাহির ও বর্ষার দীর্ঘদিনের পরিচয়। তবে তারা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছে দেড় বছর আগে। নিহত জোবায়েদ এক বছর ধরে বর্ষাকে পড়াতো। মেয়েটা জোবায়েদের প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। মেয়েটার অবস্থা ছিলো এমন যে- সে যখন যার কাছে যেতো তার কথা বলতো।

এমন অবস্থায় মাহিরকে তার প্রেমিকা বর্ষা বলেছে, ‘জোবায়েদকে না সরাতে পারলে আমি তোমার হতে পারবো না’। এভাবেই তারা জোবায়েদকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। মাহিরের এক আঘাতেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায় জোবায়েদ।


মাহিরকে তার মা থানায় হস্তান্তরের বিষয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, আসামি গ্রেফতারে পুলিশের নানা ধরনের কৌশল থাকে। আগে চট্টগ্রামের রাউজানে নিয়মিত শিক্ষার্থী অপহরণ করতো, মুক্তিপণ আদায় করতো। আমরা তখন অপহরণকারীদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে তাদের ব্যবহার করে সমোজতার চেষ্টা করতাম। ঠিক এভাবেই আমরা মাহিরকে থানায় দিয়ে যেতে চাপ প্রয়োগ করেছি। এটা আমাদের কৌশলের অংশ। স্বেচ্ছায় থানায় হস্তান্তর করা হয়নি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হত্যার পুরো পরিকল্পনা বর্ষার। বরগুনার মিন্নির ঘটনার সঙ্গে অনেকাংশ মিল রয়েছে। মেয়েটা দুজনের কারো কাছ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। ফলে সে নিজেই হত্যার পরিকল্পনা সাজায়।

হত্যার পরিকল্পনায় রাজনৈতিক কোনো বিষয় ছিলো কি না জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, মাহির ও বর্ষা ২৬ সেপ্টেম্বর হত্যার পরিকল্পনা করে। এখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই। এটা ত্রিভুজ প্রেমের ঘটনা।

হত্যার মুহূর্তে জোবায়েদেকে প্রেমিকা বর্ষার শেষ কথার বিষয়ে লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, বর্ষা আমাদের নিশ্চিত করেছে-জোবায়েদ মারা যাওয়ার সময় সে (বর্ষা) উপস্থিত ছিল।

তদন্তে জানা গেছে, জোবায়েদের শেষ কথা ছিল বর্ষাকে উদ্দেশ্য করে ‘আমাকে বাঁচাও’। বর্ষা তখন জোবায়েদেরে উদ্দেশ্যে বলে, ‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হব না’। তদন্তে প্রকাশ পায় যে, দোতলার সিঁড়িতে জোবায়েদকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় সে বাঁচার চেষ্টা করছিল। বর্ষাদের বাসা পাঁচতলায় হলেও ঘটনার সময় সে তিনতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নীচের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে।

জুবায়েদ দোতলার কলিং-বেল বাজিয়ে দরজায় ধাক্কা দেয় এবং দরজা থেকে রক্ত নিচে গড়িয়ে পড়ছিল। দোতলায় থাকা ব্যক্তির ওজন অনেক বেশি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, জোবায়েদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ১৯-২০ শিক্ষা বর্ষের ১৫ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনায় কৃষ্ণপুর গ্রামে। গতকাল সোমবার জোবায়েদকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সেভ করুন

সর্বাধিক পঠিত

মিরপুরে ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হতে পারবো না’

সর্বশেষ আপডেট : ০১:৫৭:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

রাজধানীর পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসাইনকে যখন হত্যা করা হয় তখন সিঁড়িতে ছটফট করতে থাকেন।

ঘাতক মাহিরের ছুরিকাঘাতে আহত জোবায়েদ তার ছাত্রী ও প্রেমিকা বর্ষার কাছে শেষ মুহূর্তে বাঁচার আকুতি জানালে ওই সময় জোবায়েদের উদ্দেশ্যে বর্ষা বলে, ‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হতে পারবো না’।

নিষ্ঠুর সেই মুহুর্তে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পরেন জোবায়েদ। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান জবির এই ছাত্রদল নেতা। হত্যার পরিকল্পনায় নাম উঠে আসা জোবায়েদের ছাত্রী ও প্রেমিকা বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, বর্ষার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন তার প্রথম প্রেমিক মাহির।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবায়েদ পুরান ঢাকার বংশাল থানার নুর-বক্স লেনের একটি বাসায় ছাত্রীকে পড়াতে গিয়ে হত্যার শিকার হন। নিহত জোবায়েদ বর্ষাকে পড়াতে গিয়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমিকা বর্ষা একই সময়ে মাহির ও জোবায়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলো।

ত্রিভুজ প্রেম থেকে বের হতে নিজেই হত্যার পরিকল্পনা সাজায় বর্ষা। এই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে ছাত্রী বর্ষা- তার প্রথম প্রেমিক মো. মাহির ও তার বন্ধু ফারদিন আহমেদ আইলানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।



তিনি আরও বলেন, বর্ষা একই সময়ে তার গৃহ শিক্ষক জোবায়েদ ও মাহিরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলো। গত ২৬ সেপ্টেম্বর বর্ষার প্রথম প্রেমিক মাহির বিষয়টি নিয়ে বর্ষাকে চাপ প্রয়োগ করলে সেদিনই গৃহশিক্ষক জোবায়েদকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তারা। পরবর্তীতে মাহির ও তার বন্ধু আইলান মিলে চাকু কিনে গত ১৯ অক্টোবর বর্ষার বাসায় অবস্থান নেয়। আর বর্ষা তার শিক্ষক ও প্রেমিক জোবায়েদকে ডেকে আনেন। এরপরই বর্ষার বাসার সিঁড়ি রুমে জোবায়েদকে বলা হয় বর্ষার থেকে সরে আসতে। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে জোবায়েদকে গলায় পোঁচ দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় তাদের তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, আমরা তদন্তে পেয়েছি মাহির একই বাসায় ভাড়া থাকতো। মাহির ও বর্ষার দীর্ঘদিনের পরিচয়। তবে তারা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছে দেড় বছর আগে। নিহত জোবায়েদ এক বছর ধরে বর্ষাকে পড়াতো। মেয়েটা জোবায়েদের প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। মেয়েটার অবস্থা ছিলো এমন যে- সে যখন যার কাছে যেতো তার কথা বলতো।

এমন অবস্থায় মাহিরকে তার প্রেমিকা বর্ষা বলেছে, ‘জোবায়েদকে না সরাতে পারলে আমি তোমার হতে পারবো না’। এভাবেই তারা জোবায়েদকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। মাহিরের এক আঘাতেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায় জোবায়েদ।


মাহিরকে তার মা থানায় হস্তান্তরের বিষয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, আসামি গ্রেফতারে পুলিশের নানা ধরনের কৌশল থাকে। আগে চট্টগ্রামের রাউজানে নিয়মিত শিক্ষার্থী অপহরণ করতো, মুক্তিপণ আদায় করতো। আমরা তখন অপহরণকারীদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে তাদের ব্যবহার করে সমোজতার চেষ্টা করতাম। ঠিক এভাবেই আমরা মাহিরকে থানায় দিয়ে যেতে চাপ প্রয়োগ করেছি। এটা আমাদের কৌশলের অংশ। স্বেচ্ছায় থানায় হস্তান্তর করা হয়নি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হত্যার পুরো পরিকল্পনা বর্ষার। বরগুনার মিন্নির ঘটনার সঙ্গে অনেকাংশ মিল রয়েছে। মেয়েটা দুজনের কারো কাছ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। ফলে সে নিজেই হত্যার পরিকল্পনা সাজায়।

হত্যার পরিকল্পনায় রাজনৈতিক কোনো বিষয় ছিলো কি না জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, মাহির ও বর্ষা ২৬ সেপ্টেম্বর হত্যার পরিকল্পনা করে। এখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই। এটা ত্রিভুজ প্রেমের ঘটনা।

হত্যার মুহূর্তে জোবায়েদেকে প্রেমিকা বর্ষার শেষ কথার বিষয়ে লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, বর্ষা আমাদের নিশ্চিত করেছে-জোবায়েদ মারা যাওয়ার সময় সে (বর্ষা) উপস্থিত ছিল।

তদন্তে জানা গেছে, জোবায়েদের শেষ কথা ছিল বর্ষাকে উদ্দেশ্য করে ‘আমাকে বাঁচাও’। বর্ষা তখন জোবায়েদেরে উদ্দেশ্যে বলে, ‘তুমি না সরলে আমি মাহিরের হব না’। তদন্তে প্রকাশ পায় যে, দোতলার সিঁড়িতে জোবায়েদকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় সে বাঁচার চেষ্টা করছিল। বর্ষাদের বাসা পাঁচতলায় হলেও ঘটনার সময় সে তিনতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নীচের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে।

জুবায়েদ দোতলার কলিং-বেল বাজিয়ে দরজায় ধাক্কা দেয় এবং দরজা থেকে রক্ত নিচে গড়িয়ে পড়ছিল। দোতলায় থাকা ব্যক্তির ওজন অনেক বেশি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, জোবায়েদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ১৯-২০ শিক্ষা বর্ষের ১৫ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনায় কৃষ্ণপুর গ্রামে। গতকাল সোমবার জোবায়েদকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।