কিছুদিন আগেও নোয়াখালীর সেনবাগের জনগণ চাঁদা তুলে পড়ালেখার খরচ জুগিয়েছে বৈষম্যবিরোধী অন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদের।
নবীপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকায় আসেন রিয়াদ। ভর্তি হন রাজধানীর গুলশানের প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে। বর্তমানে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত রিয়াদের দিন চলত দানের টাকায় টেনেটুনে।
সেই রিয়াদই যেন গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে হাতে পেয়েছেন ‘আলাদীনের চেরাগ’। তার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই লেনদেন হয়েছে কোটি টাকা। চলতি মাসে তার ওই অ্যাকাউন্টে সর্বশেষ জমা হয়েছে ১৩ লাখ টাকা। এছাড়া রাজধানীর নাখালপাড়ার বাসায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি চেক পেয়েছে।
বাসা থেকে আরও উদ্ধার করেছে ১০টি এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) স্লিপ। এসব টাকার বেশিরভাগের উৎস চাঁদাবাজি, তদবির আর জমি দখলের ঠিকাদারি।
রিয়াদের চাঁদাবাজির তথ্যে হতভম্ব খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীরা ছিল তার চাঁদাবাজির মূল টার্গেট।
গুলশান থানায় রিয়াদসহ তার ছয় সহযোগীর বিরুদ্ধে হওয়া চাঁদাবাজির মামলার তদন্ত নেমে এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
আরও পড়ুন : আগামী সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাজ্য
সমন্বয়ক পরিচয়ে গুলশানের ৮৩ নম্বর রোডে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে রিয়াদ ও তার সহযোগীরা। শাম্মী আহমেদ দেশের বাইরে আছেন।
বাসায় ছিলেন তার স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর। গত ১৭ জুলাই সকালে বাসায় গিয়ে মব সৃষ্টি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা নিয়ে আসে এ চক্রটি। পরে গত শনিবার সন্ধ্যায় ফের গুলশানের ওই বাসায় চাঁদার টাকা আনতে গিয়ে গুলশান থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন পাঁচ চাঁদাবাজ।
তারা হলেন-বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান ওরফে রিয়াদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহীম হোসেন মুন্না, ঢাকা মহানগর শাখার সদস্য মো. সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাব এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মী মো. আমিনুল ইসলাম।
এদের প্রত্যেককে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আমিনুল ছাড়া অপর চারজন রিমান্ডে রয়েছে। মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে রেখে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ৭ দিনের রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদে চাঁদাবাজির
ডিএমপির গুলশান বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘রিয়াদের টার্গেটই ছিল আওয়ামী লীগ ধর, পয়সা খাও। প্রতিদিনই সে বিভিন্ন এলাকায় কোর্ট বসাত। রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় বসবাস করা আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি (রংপুর-৬ আসন) আবুল কালাম আজাদের কাছ থেকেও ৫ কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছে রিয়াদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘রিয়াদের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্প্রতি ঢুকেছে ১১ থেকে ১৩ লাখ টাকা। অন্যান্য ব্যাংকেও তার অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
সেগুলোতে কী পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়েছে এবং বর্তমানে কত টাকা জমা আছে তার তথ্য আমরা সংগ্রহের চেষ্টা করছি।’ জানতে চাইলে গুলশান থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছি। সেগুলো নিয়ে কাজ করছি।
সোমবার রাতে রাজধানীর নাখালপাড়ার বাসায় অভিযান চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে ওসি হাফিজুর বলেন, তদন্তের স্বার্থে যেখানে যেখানে অভিযান চালানো দরকার আমরা পর্যায়ক্রমে চালাব।
আরও পড়ুন : চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপির ৩ নেতা বহিষ্কার
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সোমবার রাতে পুলিশ রিয়াদের নাখালপাড়ার বাসায় অভিযান চালায়। এ সময় বাসা থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি চেকের সন্ধান পায় পুলিশ। আগামী ২ আগস্ট ওই চেকটি ক্যাশ হওয়ার কথা ছিল।
গুলশানে আওয়ামীপন্থি এক ব্যবসায়ীর জমি উদ্ধারের জন্য ৫ কোটি টাকার চুক্তি হয় রিয়াদের সঙ্গে। সেই চুক্তির ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার লেনদেনের চেক ছিল রিয়াদের বাসায়।
এছাড়াও পুলিশ তার ঘর থেকে অন্তত ১০টি এফডিআরের স্লিপ পেয়েছে। সেখানে ২০ লাখ টাকার বেশি জমা রয়েছে। গত কয়েক মাসে রিয়াদের একটি বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টেই ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা ডেস্ক 









